BUP, Uncategorized

________সাবজেক্ট রিভিউঃ আইসিটি________

Related image
“আলকেমিস্ট” বইয়ের রুটিওয়ালা স্বপ্ন দেখতো পর্যটক হবার। কিন্তু সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য রাখালবালক হয়ে দেশবিদেশ ঘুরে না বেড়িয়ে সে স্বপ্নকে চাপা দিয়েছিলো কারণ মানুষের চোখে রুটিওয়ালার জীবন রাখালবালকের থেকে বেশি সম্মানের। তাই সমাজকে খুশি করতে গিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করা হয়নি। আমরা বেশিভাগই একেকজন রুটিওয়ালা, নিজের স্বপ্ন পূরণ না করে আগে চিন্তা করি কি নিয়ে পড়ালেখা করলে বেশি টাকার চাকরী পাওয়া যাবে। একটা বিষয়ের “ব” না জেনে হুট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাই চাকরির আশায়, তারপর একসময় হতাশা ঘিরে ধরে।
কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি খুবই জনপ্রিয় একটা বিষয়। এই বিষয়টা নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভূল ধারণা প্রচলিত আছে, এই সাবজেক্টটাতে কি পড়ানো হয় এ বিষয়ে সবার ভালো ধারণা নেই। সবথেকে দু:খজনক ব্যাপার হলো এই সাবজেক্টে কি পড়ানো হয় সেটা না জেনেই বহু ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে যায় চাকরীর বাজার ভালো এই কারণে, এটা শুধু কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি না বরং বাংলাদেশে যেকোনো সাবজেক্টের জন্যই সত্য। এরপর যেটা হয় সেটা হলো খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ে।
আমার সৌভাগ্য যে কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি সম্পর্কে ভালো না জানলেও প্রোগ্রামিং আমার আগে থেকেই ভালো লাগতো এবং কম্পিউটার নিয়ে অনেক আগ্রহ ছিলো ছোটোবেলা থেকে তাই এখন আনন্দময় সময় কাটাতে পারছি, কিন্তু সবার এই সৌভাগ্য হয়না, এবং এটা শুধু সিস্টেমের দোষ না সাথে নিজেদের অসচেতনতাও বিশাল অংশে দায়ী। আমি অনেক বন্ধুবান্ধবকে দেখেছি ভর্তি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে চাকরীর বাজার দেখে সাবজেক্ট বেছে নিয়ে এখন হতাশ হয়ে পড়েছে।
আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কম্পিউটার সায়েন্সে কি কি পড়ানো হয় সেটা সবাইকে জানানো, বিশেষ করে কম বয়েসীদের যারা এখনো কোনো বিষয় বেছে নেয়নি এবং তাদের অভিভাবকদের। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অনেক গাইডলাইন থাকলেও সাবজেক্ট নিয়ে গাইডলাইনের অভাব আছে। আর যেগুলো আছে সেগুলোতেও কম্পিউটার সায়েন্সে ক্রিয়েটিভিটি লাগে, মুখস্থ কম করতে হয় এসব কথাবার্তা শুধু লিখে রাখসে, আসলে কি কি পড়ানো হয় সেটা লিখেনি।
বাংলাদেশের মানুষের এক অংশের ধারণা কম্পিউটার সায়েন্সে ওয়ার্ড, পাওয়ারপয়েন্ট এসব শেখানো হয়, এবং এগুলো যেহেতু পাড়ার দোকানদারও ভালো পারে তাই কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার কোনো মানে নাই। আবার কম্পিউটার সম্পর্কে ভালো জানে, টুকটাক প্রোগ্রামিংও কিছুটা জানে এমন মানুষের ধারণা এখানে শুধু এইচটিমিএল, পিএইচপিতে এ ওয়েবসাইট বানানো শেখায়, যেগুলো কম্পিউটার সায়েন্স না পড়লেও শেখা যায়, ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে এই ধারণাটা বেশি কাজ করে।
এখন আমরা তাহলে এক এক করে দেখি কম্পিউটার সায়েন্সে/আইসিটিতে কি কি টপিক পড়তে হবে। টপিকগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আমরা জানবো। এরপরে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে উপরের ধারণা গুলো কতটা সত্যি। টপিকগুলো সম্পর্কে জেনে এখন কাজ হবে তোমার ভেবে দেখা এই সাবজেক্টটা কি সত্যিই তোমার পছন্দ নাকি তুমি ইলেকট্রিকাল, মেকানিকাল , ফিজিক্স বা অন্য কোনো সাবজেক্ট পড়বে।
১) প্রোগ্রামিং
২)অ্যালগোরিদম
৩)ডাটা স্ট্রাকচার
৪) গণিত
৫) অপারেটিং সিস্টেম এবং সিস্টেম প্রোগ্রামিং
৬) ডাটাবেস
৭) ডাটা এনালাইসিস
৮) আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স(এ.আই)
৯) কম্পাইলার
১০) গ্রাফিক্স
১১) নেটওয়ার্কিং
১২) ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম
১৩) সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং
১৪) এনালগ এন্ড ডিজিটাল কমিউনিকেশন
১৪) রাডার ইঞ্জিনিয়ারিং
১৫) মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশন
১৬) মাইক্রোপ্রসেসর ও ইন্টারফেসিং
১৭) মোবাইল ও সেলুলার কমিউনিকেশন
১৮) টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম
১৯) ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স
২০) সিগন্যাল প্রসেসিং
এছাড়াও আরও কিছু কোর্স পড়ানো হয়। এটা ভার্সিটির উপর নির্ভর করে। তবে এগুলা সব ভার্সিটি তেই পড়ানো হয়ে থাকে ।
কম্পিউটার সায়েন্সের/আইসিটি আকর্ষণীয় একটা দিক হলো “কনটেস্ট”। সারাবছরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা কোম্পানি প্রোগ্রামিং কনটেস্ট এবং সফটওয়্যার কনটেস্ট আয়োজন করে। প্রোগ্রামিং কনটেস্টে মূলত অলিম্পিয়াড স্টাইলে অ্যালগোরিদমের সাহায্যে প্রবলেম সলভ করতে হয়। এখানে সুযোগ আছে সারা বিশ্বের বড় বড় প্রোগ্রামারদের সাথে কনটেস্ট করার। বাংলাদেশের মানুষের গর্ব করার মতো জিনিস খুব বেশি নেই, তবে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট অবশ্যই সেই অল্প জিনিসগুলোর একটা, অনেকবছর ধরেই বাংলাদেশিরা এসব কনটেস্টে ভালো ফল করছে। সফটওয়্যার কনটেস্টে মূলত বিভিন্ন সফটওয়্যার, ওয়েব সাইট ডিজাইন করতে হয়, মোবাইল বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েড ভিত্তিক মোবাইলের সফটওয়্যার কনটেস্ট বর্তমানে খুব জনপ্রিয়। মাইক্রোসফট ইমেজিন কাপের মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার কনটেস্টেও বাংলাদেশিরা অংশ নেয়। আবার তুমি চাইলে হার্ডওয়্যার কনটেস্টও করতে পারো, দারুণ একটা রোবট বানিয়ে চমকে দিতো পারো সবাইকে।
আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হল

আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো গবেষণার সুযোগ। কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি শেষ বর্ষে কিছু ক্রেডিট থাকে গবেষণা বা প্রজেক্টের জন্য। প্রতি বছরই বাংলাদেশের অনার্সের ছাত্ররা ভালো ভালো জার্নালে পেপার পাবলিশ করে থাকে। কম্পিউটার সাইন্সের গবেষণার একটা সুবিধা হলো নিজের ডেস্কটপ কম্পিউটার ব্যবহার করেই বড় বড় গবেষণা করে ফেলা যায়, কোটি টাকা যন্ত্রপাতির দরকার হয় না(অবশ্যই দরকার হয়, তবে সেগুলো ছাড়াও অনেক কাজ করা যায়)। কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি অনার্স করে তুমি চাইলে অন্যান্য বিষয় নিয়েও পড়ালেখা করতে পারো কারণ এখন সবকাজে কম্পিউটার দরকার হয়। যেমন রিসেন্টলি অ্যাস্ট্রোইনফরমেটিক্স নামের একটা সাবজেক্ট নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, এদের কাজ মহাকাশ গবেষণায় কম্পিউটারকে আরো ভালোভাবে কিভাবে ব্যবহার করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করা। তুমি চাইলে ফিজিক্সের লাইনে গিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে কাজ করতে পারো। আবার বায়োলজী ভালো লাগলে বায়োইনফরমেটিক্স নিয়ে পড়ালেখা করতে পারো, কাজ করতে পারবো ন্যানোটেকনোলজী, ডিএনএ/প্রোটিন অ্যানালাইসিস নিয়ে। এরকম হাজারটা সম্ভাবনা তোমার সামনে থাকবে। আশা করি লেখাটা পড়ার পর কম্পিউটার সায়েন্সে/আইসিটিতে কি পড়ানো হয় সে সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে এবং ভূল ধারণাগুলো ভেঙে গিয়েছে। চাকরির বাজার নিয়ে কিছু বলবোনা, যে আগেই চাকরির চিন্তা করে সাবজেক্ট চয়েস করে তার জন্য এ লেখা নয়, তবে তারপরেও শুধু বলে রাখি বর্তমানে কম্পিউটার সায়েন্স পরে আমি কাওকে বেকার বসে থাকতে দেখিনি। ভর্তি পরীক্ষার্থীদের বলবো, যেসব সাবজেক্ট পড়ার কথা ভাবছো প্রতিটা সম্পর্কে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করো, সেখানে কি কি পড়ানো হয় সেটা খোজ নাও, এবং যদি সেগুলো তোমার সত্যিই পছন্দ হয় তাহলেই ভর্তি হয়ে যাও, কোনো সাবজেক্টই ১ নম্বর-২ নম্বর না, ইলেক্ট্রিকাল মোটেও মেকানিকালের থেকে “ভালো সাবজেক্ট” না, সেটাই তোমার কাছে “ভালো সাবজেক্ট” যেটা তোমার পছন্দ, সেটা যদি পুষ্টিবিজ্ঞানের মতো মানুষের চোখে পিছের দিকের সাবজেক্ট হয় তাহলেও সেটা ভালো, মানুষই তৈরি বিভাজন অনুসরণ করলে নিজের সাথে প্রতারণা করা হয়। এই সাবজেক্ট এ পড়ার আগে ভালো করে জেনে রাখবাঃ এ সেক্টরে মামা-খালু-নগত পাতি দিয়ে তেমন কোন সুবিধা করা যায় না যদি নিজের ঘিলুতে কিছু না থাকে।কম্পিউটার সায়েন্স/আইসিটি একটা অদ্ভুত বিষয়। বাংলাদেশে এই বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পরে কেউ কেউ সরাসরি গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন, মাইক্রোসফটে চলে যায়। এছাড়াও এশিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন কোম্পানীতেও যায়। এসব জায়গায় একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটের বেতন হয় জায়গাভেদে তিন থেকে সাত লক্ষ টাকা! তাহলে তো সবারই সিএসই পড়া উচিত। কিন্তু আসলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পাশ করার পরে দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি জোটাতেই হিমশিম খায়, গুগল-ফেসবুক তো অনেক দূরের কথা। দেশের মধ্যেও যারা চাকরি পায়, তাদের কারো কারো বেতন শুরুতে ৫০-৬০ হাজার টাকা। আর কারো কারো বেতন ১০-১৫ হাজার টাকা। এর কারণ কী? এত বৈষম্য কেন? সবই কি মামা-চাচার জোর? কারণটা হচ্ছে দক্ষতা। আশা করছি ব্যাপারটা ক্লিয়ার করতে পেরেছি।

সকল ভর্তি পরীক্ষার্থীদের প্রতি শুভকামনা, আশা করি আইসিটি নিয়ে আর কোন কনফিউশন থাকবে না।

Revel Yusuf

ICT-01 Batch,BUP.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s